ভাস্কর্য (তামাসিল/تَمَاثِيْلَ) এবং উপাস্য মূর্তি বা প্রতিমা (اَصْنَامًا/اَوْثَانًا) কি এক বিষয়?

উপাস্য মূর্তি বা প্রতিমা (اَصْنَامًا/اَوْثَانًا) এবং ভাস্কর্য (তামাসিল/تَمَاثِيْلَ) এক বিষয় নয়, অর্থাৎ পূঁজা বা উপাসনার উদ্দেশ্যে তৈরি যেকোন কিছুই উপাস্য মূর্তি/প্রতিমা (idol), আর যেটা সুন্দর্য বৃদ্ধির জন্য তৈরি করা হয় সেটা ভাষ্কর্য (sculpture/statue)। যেমন নিচের আয়াতে (৩৪:১৩) আল্লাহ ভাষ্কর্য তৈরিকে বৈধতা দিয়েছেন, আবার উপাস্য মূর্তির উপাসনা থেকে বিরত থাকার নির্দেশও দিয়েছেন। এবং সেই সাথে উপাস্য মূর্তি ও ভাষ্কর্যর মধ্যকার পার্থক্যও দেখিয়ে দিয়েছেন জ্ঞানীদের জন্যে।

▪️সূরা সাবা (৩৪:১৩):-

يَعْمَلُوْنَ لَهٗ مَا يَشَآءُ مِنْ مَّحَارِيْبَ وَتَمَاثِيْلَ وَجِفَانٍ كَالْجَوَابِ وَقُدُوْرٍ رّٰسِيٰتٍ ؕ اِعْمَلُوْۤا اٰلَ دَاوٗدَ شُكْرًا ؕ وَقَلِيْلٌ مِّنْ عِبَادِيَ الشَّكُوْرُ

তারা (জ্বীনরা) তৈরী করত সুলাইমানের ইচ্ছানুযায়ী তার জন্য প্রাসাদ, ভাস্কর্য (তামাসিল/تَمَاثِيْلَ), সুবিশাল হাউযের মত বড় পাত্র ও স্থির হাড়ি। ‘হে দাঊদ পরিবার, তোমরা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আমল করে যাও এবং আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ’।

⛔ 👉 আল্লাহ তামাসিল (تَمَاثِيْلَ) শব্দটি দিয়ে সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির ভাষ্কর্যর কথা বলেছেন যা পূঁজার মূর্তি নয়। আর এই তামাসিলের একটি উদাহরণ হচ্ছে ২১:৫২ আয়াত, যেখানে ইব্রাহিম (আ:) প্রথমে পূঁজার মূর্তিগুলোকে সৌন্দর্য বৃদ্ধির ভাষ্কর্য (তামাসিল/تَمَاثِيْلَ) হিসেবে সম্মধন করে তার পিতা ও কওমকে জিজ্ঞেস করার পরে যখন জানতে পারলে যে এগুলো উপাস্য মূর্তি (اَصْنَامًا/اَوْثَانًا), তখন তিনি এগুলোকে সুন্দর্য বৃদ্ধির ভাষ্কর্য (تَمَاثِيْلَ) না বলে বলেছেন পূঁজার বা উপাস্য মূর্তি (اَصْنَامًا/اَوْثَانًا)(২১:৫৭)।

▪️সূরা আম্বিয়া (২১:৫২):-
اِذْ قَالَ لِاَبِيْهِ وَقَوْمِهٖ مَا هٰذِهِ التَّمَاثِيْلُ الَّتِيْۤ اَنْتُمْ لَهَا عٰكِفُوْنَ

যখন সে তার পিতা ও তার কওমকে বলল, ‘এ ভাস্কর্যগুলো (تَمَاثِيْلَ) কী, যেগুলোর সামনে তোমরা নিষ্ঠাবান হয়ে বসে আছো’?

▪️সূরা আম্বিয়া (২১:৫৩):- তারা বলল, ‘আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এদের পূজা করতে দেখেছি’।

▪️সূরা আম্বিয়া (২১:৫৪):- সে বলল, ‘তোমরা নিজেরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা সবাই রয়েছ স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে’।

▪️সূরা আম্বিয়া (২১:৫৫):- তারা বলল, ‘তুমি কি আমাদের নিকট সত্য নিয়ে এসেছ, নাকি তুমি খেল-তামাশা করছ’?

▪️সূরা আম্বিয়া (২১:৫৬):- সে বলল, ‘না, বরং তোমাদের রব তো আসমানসমূহ ও যমীনের রব; যিনি এ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। আর এ বিষয়ে আমি অন্যতম সাক্ষী’।

▪️সূরা আম্বিয়া (২১:৫৭):-
وَتَاللّٰهِ لَاَكِيْدَنَّ اَصْنَامَكُمْ بَعْدَ اَنْ تُوَلُّوْا مُدْبِرِيْنَ

‘আর আল্লাহর কসম, তোমরা চলে যাওয়ার পর আমি তোমাদের মূর্তিগুলোর (اَصْنَامَكُمْ) ব্যাপারে অবশ্যই কৌশল অবলম্বন করব’।

👉 আরো আয়াত দেখুনঃ —

▪️সূরা ইব্রাহীম (১৪:৩৫):-

وَاِذْ قَالَ اِبْرٰهِيْمُ رَبِّ اجْعَلْ هٰذَا الْبَلَدَ اٰمِنًا وَّاجْنُبْنِيْ وَبَنِيَّ اَنْ نَّعْبُدَ الْاَصْنَامَ ؕ

আর স্মরণ কর ‘যখন ইবরাহীম বলল, ‘হে আমার রব, আপনি এ শহরকে নিরাপদ করে দিন এবং আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে মূর্তি (الْاَصْنَامَ) পূজা থেকে দূরে রাখুন’।

▪️সূরা আনকাবুত (২৯:২৫):-

وَقَالَ اِنَّمَا اتَّخَذْتُمْ مِّنْ دُوْنِ اللّٰهِ اَوْثَانًا ۙ مَّوَدَّةَ بَيْنِكُمْ فِي الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا ۚ ثُمَّ يَوْمَ الْقِيٰمَةِ يَكْفُرُ بَعْضُكُمْ بِبَعْضٍ وَّيَلْعَنُ بَعْضُكُمْ بَعْضًا ۫ وَّمَاْوٰىكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُمْ مِّنْ نّٰصِرِيْنَ ۙ

আর ইবরাহীম বলল, ‘দুনিয়ার জীবনে তোমাদের মধ্যে মিল-মহব্বতের জন্যই তো তোমরা আল্লাহ ছাড়া মূর্তিদেরকে (اَوْثَانًا) গ্রহণ করেছ। তারপর কিয়ামতের দিন তোমরা একে অপরকে অস্বীকার করবে এবং পরস্পর পরস্পরকে লা‘নত করবে, আর তোমাদের নিবাস জাহান্নাম এবং তোমাদের জন্য থাকবে না কোন সাহায্যকারী’।

📍 সুতরাং, তামাসিল (تَمَاثِيْلَ) শব্দটিকে পূঁজা বা উপাসনার মূর্তি কিংবা প্রতিমা হিসেবে কুরআনে ব্যবহার করা হয়নি, বরং ভাস্কর্য হিসেবেই ব্যাবহার করা। আর যদি উপাস্য মূর্তি বা প্রতিমা হিসেবে তামাসিল (تَمَاثِيْلَ) শব্দটিকে ব্যাবহার করা হতো, তাহলে সোলায়মান (আঃ) যেহেতু তামাসিল (تَمَاثِيْلَ) নির্মাণ করেছিলেন (৩৪:১৩) এবং কুরআনের অন্য আয়াতের যদি এই তামাসিল (تَمَاثِيْلَ) হারাম বলা হয়ে থাকতো তাহলে কুরআনের একটি আয়াত অপরটির সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে যেত অর্থাৎ একটি আয়াত আরেকটি বিপরীত বা বৈপরীত্য হতো। অথচ আল্লাহ এই ব্যাপারে বলেছেনঃ–

▪️সূরা আন নিসা (৪:৮২):-

اَفَلَا يَتَدَبَّرُوْنَ الْقُرْاٰنَ ؕ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللّٰهِ لَوَجَدُوْا فِيْهِ اخْتِلَافًا كَثِيْرًا

তারা কি কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না? আর যদি তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হত, তবে অবশ্যই তারা এতে অনেক বৈপরীত্য দেখতে পেত।

সুতরাং, ভাস্কর্য অর্থাৎ তামাসিল (تَمَاثِيْلَ) এবং উপাস্য মূর্তি বা প্রতিমা (اَصْنَامًا/اَوْثَانًا) এক নয়। আর আল্লাহ ভাস্কর্য নির্মাণ করতে নিষেধ করেন নাই, বরং উপাস্য মূর্তি বা প্রতিমা নির্মাণ ও তার উপাসনা করতে নিষেধ করেছেন।

মৃত মাছ খাওয়ার হুকুম বা বিধান!

সাধারণত মানুষ যে ভুলটা বেশি করে, সেটা হলো সাধারণ আইন (General law) এবং বিশেষ বা সুনির্দিষ্ট আইন (Special or Specific law) এর মধ্যকার পার্থক্য না বুঝা। আর সে কারণে অনেকেই প্রশ্ন করে যে কুরআনে যেহেতু মৃত জীব খাওয়া হারাম বলা হয়েছে (সূরা বাকার ১৭৩), সেহেতু মৃত মাছ খাওয়া কি হারাম নয়?

➡️সংক্ষেপে উত্তর হচ্ছে:- না, হারাম নয় অর্থাৎ মৃত মাছ খাওয়া যাবে।

এবার আসুন কুরআন থেকে জেনে নেই কিভাবে মৃত মাছ খাওয়া যাবে বা জায়েজ। … এর উত্তর খোঁজার জন্যে কুরআনের কতিপয় আয়তগুলো একটু বিশ্লেষণ করেলে দেখতে পাবেন যে আল্লাহ তার কিতাবে স্পষ্ট করেই উত্তর দিয়েছেন।

(General Law) সূরা বাকারার ১৭৩ নং আয়াত এবং সূরা মায়েদাহ এর ৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন “মৃত জীব” খাওয়া হারাম। — কিন্তু এখানে বলা হয়নি মৃত জীব কি স্থলের নাকি জলের! সুতরাং এই আইনটি স্থল এবং জল দুইয়ের জন্যেই প্রযোজ্য হবে General Law হিসেবে ততক্ষণ যতক্ষণনা আল্লাহ স্পষ্ট করে অন্য আয়াতে কিছু বলে থাকেন অর্থাৎ Special Law.

(General Law & Special Law এর পার্থক্য) সূরা মায়েদাহ এর ৫:৯৬ নং আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ-

أُحِلَّ لَكُمْ صَيْدُ ٱلْبَحْرِ وَطَعَامُهُۥ مَتَٰعًا لَّكُمْ وَلِلسَّيَّارَةِۖ وَحُرِّمَ عَلَيْكُمْ صَيْدُ ٱلْبَرِّ مَا دُمْتُمْ حُرُمًاۗ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ٱلَّذِىٓ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ

তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে সমুদ্রের শিকার ও তার খাদ্য; তোমাদের ও মুসাফিরদের ভোগের জন্য। আর স্থলের শিকার তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে যতক্ষণ তোমরা ইহরাম অবস্থায় থাক। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর, যার দিকে তোমাদেরকে একত্র করা হবে।

অর্থাৎ স্থলের শিকার বৈধ থাকলেও ইহরাম অবস্থায় কখনোই সেটা বৈধ নয়, অথচ সূরা বাকারার ১৭৩ এবং সূরা মায়েদাহ এর ৩ নং আয়াতে (General Law) বলা হয়েছে স্থলের শিকার আল্লাহর নামে জবেহ দিলে সেটা হালাল। অন্যদিকে, ৫:৯৬ আয়াতে ইহরাম অবস্থায় মাছ শিকারকে হারাম করা হয়নি। — তাহলে এখানে থেকে এটা স্পষ্ট বুঝা যায় যে স্থলের জীব আর জলের জীব সমান নয়। অর্থাৎ জল থেকে যে কোন সময় শিকার করা হালাল, কিন্তু ইহরাম অবস্থায় স্থল থেকে শিকার করা হারাম।

এবার দেখুনঃ–(Special Law) আল্লাহ সূরা আন-নাহল এর ১৪ নং আয়াতে বলেছেন:-

وَهُوَ الَّذِيْ سَخَّرَ الْبَحْرَ لِتَاْكُلُوْا مِنْهُ لَحْمًا طَرِيًّا وَّتَسْتَخْرِجُوْا مِنْهُ حِلْيَةً تَلْبَسُوْنَهَا ۚ وَتَرَي الْفُلْكَ مَوَاخِرَ فِيْهِ وَلِتَبْتَغُوْا مِنْ فَضْلِهٖ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُوْنَ

আর তিনিই সে সত্তা, যিনি সমুদ্রকে নিয়োজিত করেছেন, যাতে তোমরা তা থেকে তাজা গোশ্ত খেতে পার এবং তা থেকে বের করতে পার অলংকারাদি, যা তোমরা পরিধান কর। আর তুমি তাতে নৌযান দেখবে তা পানি চিরে চলছে এবং যাতে তোমরা তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করতে পার এবং যাতে তোমরা শুকরিয়া আদায় কর।

“আর তিনিই সে সত্তা, যিনি সমুদ্রকে (ٱلْبَحْرَ) নিয়োজিত করেছেন, যাতে তোমরা তা থেকে (مِنْهُ) তাজা (طَرِيًّا) গোশ্ত (لَحْمًا) খেতে পার…”

অর্থাৎ সমুদ্র থেকে তাজা মাছের কথা বলা হয়নি, বরং বলা হয়েছে তাজা গোশ্ত (لَحْمًا طَرِيًّا) খাওয়ার কথা! অর্থাৎ জেলেদের জালে আটকে থাকা কোন মাছ যদি মৃতও হয় কিন্তু পঁচে না যায় বরং তার গোস্ত তাজা ও সজীব থাকে তাহলেও সেটা খাওয়া হালাল। অর্থাৎ গোস্ত তাজা বা সজীব হওয়া বাধ্যতামূলক, কিন্তু মাছ জীবিত হওয়া বাধ্যতামূলক নয়।

[আর তাজা গোস্ত বলতে নিশ্চই জীবিত মাছের মত গোস্ত সাঁতার কাটবে — এইটা ভাবার কোন অবকাশ নেই 😀]

তাছাড়া (Special Law) আল্লাহ সূরা ফাতির এর ১২ নং আয়াতে বলেনঃ-

وَمَا يَسْتَوِى ٱلْبَحْرَانِ هَٰذَا عَذْبٌ فُرَاتٌ سَآئِغٌ شَرَابُهُۥ وَهَٰذَا مِلْحٌ أُجَاجٌۖ وَمِن كُلٍّ تَأْكُلُونَ لَحْمًا طَرِيًّا وَتَسْتَخْرِجُونَ حِلْيَةً تَلْبَسُونَهَاۖ وَتَرَى ٱلْفُلْكَ فِيهِ مَوَاخِرَ لِتَبْتَغُوا۟ مِن فَضْلِهِۦ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

আর দু’টি সমুদ্র সমান নয়; একটি খুবই সুমিষ্ট ও সুপেয়, আরেকটি অত্যন্ত লবণাক্ত আর প্রত্যেকটি থেকে তোমরা তাজা গোশত খাও এবং আহরণ কর অলঙ্কার (মুক্ত/প্রবাল) যা তোমরা পরিধান কর। আর তুমি তাতে দেখ নৌযান পানি চিরে চলাচল করে। যাতে তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ কর এবং যাতে তোমরা শোকর কর।

অর্থাৎ আল্লাহ লবণাক্ত ও মিঠা উভয় পানির “তাজা গোশত” খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, জীবিত মাছ নয়

➡️ এবার চাইলে মাছের তাজা গোস্ত রোদে শুকিয়ে শুঁটকি বানিয়েও খেতে পারেন।😀

Design a site like this with WordPress.com
Get started